— রিমা সরকার
কুয়াশার ওপারে
— রিমা সরকার
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। ভোরের আলো তখনও কুয়াশার সাদা চাদরের আড়ালে বন্দি। ছোট্ট শহরের রেলস্টেশনটি যেন আধোঘুমে ডুবে আছে। দূরে কোথাও একটি চায়ের কেটলির শিস, আর প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় কয়েকটি কুকুর গুটিসুটি মেরে বসে।
মেঘলা প্রতিদিনের মতো আজও খুব ভোরে বেরিয়েছে। শহরের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ায় সে। স্কুল শুরু হতে এখনও অনেক দেরি, তবু সে ইচ্ছে করেই আগে বেরোয়। এই কুয়াশা, এই নির্জনতা, এই ভোর—এসবের মধ্যে সে নিজের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর গন্ধ খুঁজে পায়।
স্টেশনের পাশে একটি পুরোনো বেঞ্চ আছে। বেঞ্চটি বহু বছরের সাক্ষী। মেঘলা সেখানে বসে গরম চায়ের কাপ হাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। যদিও আকাশ দেখা যায় না, শুধু ধূসর সাদা পর্দা।
ঠিক তখনই একজন বৃদ্ধ এসে বেঞ্চের অন্য প্রান্তে বসলেন।
ধূসর শাল, মাথায় উলের টুপি, হাতে একটি পুরোনো চামড়ার ব্যাগ।
“বসতে পারি?”—বৃদ্ধ বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন।
মেঘলা হেসে বলল, “অবশ্যই।”

কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপচাপ।
বৃদ্ধ বললেন, “কুয়াশা মানুষকে অদ্ভুতভাবে থামিয়ে দেয়, তাই না?”
মেঘলা বলল, “হয়তো। আবার অনেক কিছু আড়ালও করে দেয়।”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, “যা আড়াল করে, কখনও কখনও সেটাই আবার নতুন করে দেখতেও শেখায়।”
কথাগুলো অদ্ভুত লাগল মেঘলার।
সে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
“খুঁজতে।”
“কাকে?”
“যাকে অনেক আগে হারিয়েছি।”
মেঘলা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
তারও তো হারানোর গল্প আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অয়ন নামে এক বন্ধুর সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক ছিল। দু’জনেরই স্বপ্ন ছিল—একদিন পাহাড়ে একটি ছোট্ট বাড়ি হবে, বইয়ে ভরা ঘর হবে, আর জানালার পাশে বসে দু’জনে লিখবে।
কিন্তু জীবন সব গল্প শেষ পর্যন্ত লেখে না।
একটি সড়ক দুর্ঘটনায় অয়ন আর ফিরে আসেনি।
তারপর থেকে মেঘলা বেঁচে আছে, কিন্তু পূর্ণভাবে নয়।
বৃদ্ধ যেন তার মনের কথা পড়ে ফেললেন।
“সবাইকে ভুলে যাওয়া যায় না, তাই না?”
মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।
“আপনি কীভাবে বুঝলেন?”
বৃদ্ধ চায়ের শেষ চুমুক দিয়ে বললেন,
“যারা খুব ভোরে কুয়াশার মধ্যে একা বসে থাকে, তারা সাধারণত কাউকে খুঁজতে আসে।”
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
সে বলল, “কিছু মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের জন্য অপেক্ষা করা বন্ধ হয় না।”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন,
“অপেক্ষা কখনও মানুষকে আটকে রাখে, আবার কখনও বাঁচিয়েও রাখে। কিন্তু একসময় অপেক্ষাকে বিদায় জানাতে হয়।”
মেঘলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখনই সূর্যের প্রথম আলো কুয়াশা ভেদ করতে শুরু করেছে।
ধীরে ধীরে স্টেশনের নামফলক স্পষ্ট হয়ে উঠল।
গাছগুলোও যেন সাদা আবরণ সরিয়ে নিজেদের চিনিয়ে দিল।
বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।
“আমার যাওয়ার সময় হলো।”
“আবার দেখা হবে?”
বৃদ্ধ হেসে বললেন,
“মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হয়। স্মৃতির সঙ্গে নয়।”
এই বলে তিনি কুয়াশার ভেতর দিয়ে হেঁটে চলে গেলেন।
মেঘলা কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়িয়ে দেখল—সামনে কেউ নেই।
যেন কুয়াশাই তাকে গিলে ফেলেছে।
সেদিন স্কুলে ইতিহাস পড়াতে গিয়ে সে ছাত্রছাত্রীদের বলেছিল,
“ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশার গল্প নয়। ইতিহাস হলো মানুষের স্মৃতি। আর স্মৃতি কখনও মুছে যায় না; শুধু তার রং বদলে যায়।”
বাড়ি ফিরে আলমারির ওপর রাখা অয়নের পুরোনো ডায়েরিটি খুলল মেঘলা।
শেষ পাতায় লেখা ছিল—
“যেদিন কুয়াশা কেটে যাবে, সেদিন বুঝবে আমি হারাইনি। আমি শুধু তোমার স্মৃতি থেকে জীবনের দিকে হাঁটতে বলেছি।”
ডায়েরির ভেতর থেকে একটি শুকনো কৃষ্ণচূড়ার ফুল মেঝেতে পড়ে গেল।
মেঘলা ফুলটি হাতে তুলে জানালার বাইরে তাকাল।
কুয়াশা তখন আর নেই।
নীল আকাশ ধীরে ধীরে আলোয় ভরে উঠছে।
সে অনেকদিন পর প্রথমবার নিজের মনে বলল—
“বিদায় নয়… ধন্যবাদ।”
কারণ কিছু মানুষ আমাদের সঙ্গে সারাজীবন থাকে না, কিন্তু তারা আমাদের ভেতরে এমন একটি আলো জ্বেলে দিয়ে যায়, যা অন্ধকারের মধ্যেও পথ দেখায়।
হয়তো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলো কখনও কুয়াশার এপারে নয়—
কুয়াশার ওপারেই অপেক্ষা করে থাকে।