— শুভজিৎ ভট্টাচার্য
শেষ ট্রেনের যাত্রী
— শুভজিৎ ভট্টাচার্য
রাত সাড়ে এগারোটা। প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা। দিনের কোলাহল যেন বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। স্টেশনের লোহার বেঞ্চে বসে অরিন্দম বারবার ঘড়ি দেখছিল। শেষ লোকাল ট্রেনটি আসতে এখনও দশ মিনিট বাকি।
হাওয়ায় হালকা শীতের ছোঁয়া। চায়ের দোকানদার ভাঁড়গুলো ধুয়ে গুছিয়ে রাখছে। ঘোষণার মাইকে ভেসে এল ক্লান্ত কণ্ঠ—”শেষ আপ লোকাল কয়েক মিনিটের মধ্যে প্ল্যাটফর্ম নম্বর দুইয়ে প্রবেশ করবে।”
অরিন্দমের মনে হলো, এই ঘোষণাটাও যেন তার জন্যই।
আজ অনেক বছর পর সে ফিরছে নিজের গ্রামে। বাবার মৃত্যুর পর সেই বাড়িতে আর যাওয়া হয়নি। শহরের চাকরি, সংসার, ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে নিজের শিকড়টাকেই যেন ভুলে গিয়েছিল।
ট্রেন এসে থামল। প্রায় ফাঁকা কামরা। জানালার পাশে বসে সে বাইরে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর একজন বৃদ্ধ উঠে এলেন। ধুতি, সাদা পাঞ্জাবি, কাঁধে পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ। তিনি এসে অরিন্দমের সামনেই বসলেন।
“কোথায় যাবেন বাবা?”—বৃদ্ধের প্রশ্ন।
“মাধবপুর।”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, “অনেকদিন পর ফিরছেন বুঝি?”
অরিন্দম অবাক হলো।
“কী করে বুঝলেন?”
“যারা নিয়মিত ফেরে, তাদের চোখে অপেক্ষা থাকে না। আপনার চোখে স্মৃতি আছে।”
অরিন্দম চুপ করে গেল।
ট্রেন ছুটে চলল অন্ধকার চিরে। দূরে কোথাও গ্রামের আলো জ্বলছে। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অরিন্দম বলল,
“কখনও কখনও মনে হয়, মানুষ যত বড় হয়, তত একা হয়ে যায়।”
বৃদ্ধ ধীরে মাথা নাড়লেন।
“একা হয় না বাবা, মানুষ নিজের কাছ থেকেই দূরে সরে যায়।”
কথাটা বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে লাগল।
“আপনি কোথায় নামবেন?”
“শেষ স্টেশনে।”
“সেখানে আপনার বাড়ি?”
“বাড়ি…”—বৃদ্ধ একটু হেসে বললেন—”বাড়ি তো মানুষের মনে থাকে।”
তারপর দুজনেই চুপ।
ট্রেন একের পর এক স্টেশন পার হতে লাগল। মাঝেমধ্যে দু-একজন উঠছে, আবার নেমেও যাচ্ছে। কিন্তু বৃদ্ধ আর অরিন্দমের নীরবতার মধ্যে অদ্ভুত এক আত্মীয়তা তৈরি হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ ব্যাগ থেকে একটি ছোট্ট ডায়েরি বের করলেন।
“লিখি একটু-আধটু।”
অরিন্দম পাতাগুলো উল্টে দেখল। ছোট ছোট কবিতা, কিছু ডায়েরির পাতা, কিছু অসমাপ্ত বাক্য।
একটি লাইনে লেখা—
“যে মানুষ ফিরে আসতে জানে, সে কখনও পথ হারায় না।”
অরিন্দম অনেকক্ষণ ধরে সেই লাইনটির দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ বৃদ্ধ বললেন,
“জীবনে কাউকে ক্ষমা করতে পেরেছেন?”
প্রশ্নটা অপ্রস্তুত করে দিল তাকে।
সে ধীরে বলল,
“বাবাকে পারিনি।”
বৃদ্ধ শান্ত স্বরে বললেন,
“তিনি কি আপনাকে ক্ষমা করে গেছেন?”
অরিন্দমের গলা শুকিয়ে গেল।
বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল এক তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া করে। তারপর চাকরির ব্যস্ততা। ফোন কমে গেল। একদিন খবর এল—বাবা আর নেই।
সেই অপরাধবোধ আজও তাকে ছাড়েনি।
বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
“মৃত মানুষ রাগ করে থাকে না। শুধু অপেক্ষা করে—কবে আমরা নিজেদের ক্ষমা করতে শিখব।”
ট্রেন তখন মাধবপুর স্টেশনে ঢুকছে।
অরিন্দম উঠে দাঁড়াল।
“আমি নামি।”
বৃদ্ধ মুচকি হেসে বললেন,
“যান। বাড়িটাকে আর অপেক্ষা করাবেন না।”
অরিন্দম নেমে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াল।
হঠাৎ মনে হলো, বৃদ্ধকে একটা ধন্যবাদ জানানো উচিত।
সে ফিরে তাকাল।
কামরায় কেউ নেই।
পুরো কামরা ফাঁকা।
সে অবাক হয়ে এক কামরা থেকে আরেক কামরা দেখল। কোথাও সেই বৃদ্ধ নেই।
ট্রেন ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে বহুদিন বন্ধ থাকা দরজা খুলল অরিন্দম। ধুলো জমা ঘরে বাবার পুরোনো টেবিলটি এখনও রয়েছে।
টেবিলের ড্রয়ারে একটি নীল মলাটের ডায়েরি।
কাঁপা হাতে খুলতেই সে থমকে গেল।
প্রথম পাতায় লেখা—
“যদি কোনোদিন ফিরিস, মনে রাখিস—বাড়ির দরজা বন্ধ থাকে, কিন্তু বাবার অপেক্ষা কখনও শেষ হয় না।”
নিচে বাবার স্বাক্ষর।
অরিন্দম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
অনেক বছরের জমে থাকা কান্না নীরব ঘরটিকে ভরে দিল।
বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে।
দূরে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো—
হয়তো কিছু যাত্রীর টিকিট কোনো স্টেশনের জন্য নয়।
তারা আসে শুধু পথ হারানো মানুষকে নিজের বাড়ির পথটা মনে করিয়ে দিতে।
আর সেই কারণেই, পৃথিবীর প্রতিটি শেষ ট্রেনে একজন না একজন শেষ যাত্রী আজও অপেক্ষা করে থাকেন।